বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইবার আক্রমণের হার ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাইক্রোসফটের ‘ডিজিটাল ডিফেন্স রিপোর্ট’, চেক পয়েন্ট রিসার্চ এবং আইবিএমের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার ২৫ দশমিক ৫ শতাংশের লক্ষ্যবস্তু ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন ডিজিটাল হামলার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাইবার হামলার বৈশ্বিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসরায়েল (৭ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং তৃতীয় অবস্থানে ইউক্রেন (৪ দশমিক ৮ শতাংশ)। এছাড়া তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, জাপান, কানাডা ও জার্মানি শীর্ষ দশ আক্রান্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। র্যানসমওয়্যার আক্রমণের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক ভুক্তভোগীদের ৪৩ শতাংশই মার্কিন প্রতিষ্ঠান। বিশ্বজুড়ে র্যানসমওয়্যার হামলার হার আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে, যার মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১১৯ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানপ্রতি সাপ্তাহিক সাইবার আক্রমণের সংখ্যার বিচারে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও গবেষণা খাত বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে গড়ে ৬ হাজার ৬৫৬টি সাইবার হামলার শিকার হয়। আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে, যেখানে প্রতিটি তথ্য চুরির ঘটনায় গড়ে ১০ দশমিক ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। এফবিআইয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার অপরাধের কারণে ২০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত জালিয়াতির ঘটনা ছিল ২২ হাজারের বেশি। বাংলাদেশেও সাইবার নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৬ প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক এই খাতের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে ‘বাংলাদেশ’স সাইবার সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ২০০টি বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত সাইবার লঙ্ঘনের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরোনো পিএইচপি সংস্করণ, এন্ড-অব-লাইফ সফটওয়্যার এবং দুর্বল অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে সাইবার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে ৩৮ শতাংশ, সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ৩২ শতাংশ, টেলিকম খাতে ১৫ শতাংশ, ই-কমার্স খাতে ১০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৫ শতাংশ সাইবার হামলা হয়েছে। দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব এবং ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাকে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
Article source: Ajker Patrika | Image credit: Ajker Patrika